পাট, হোগলাপাতা, কচুরিপানা কিংবা খড়ের মতো প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প ও নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরি করছেন ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার ব্যাসদি গ্রামের নারী উদ্যোক্তা সাবেকুন্নাহার মিতু। তার পরিচালিত ‘লাম ক্রিয়েশনের’ দুটি কারখানায় উৎপাদিত এসব পণ্য বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এ উদ্যোক্তা সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নারী উদ্যোক্তা সম্মাননা পেয়েছেন।
শিক্ষাজীবন শেষে জমানো কিছু টাকা ও স্বর্ণালংকার বিক্রি করে উপজেলার কামালদিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত শ্রীপুর গ্রামে একটি হস্তশিল্প কারখানা গড়ে তোলেন সাবেকুন্নাহার মিতু। প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগে ১২টি মেশিন কিনে মাত্র ১৫ জন নারী শ্রমিক নিয়োগ করেন। বর্তমানে তার মালিকানাধীন দুটি কারখানায় প্রায় ২০০ শ্রমিক কাজ করছেন। এছাড়া কারখানার বাইরে চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন গ্রামে কাজ করছেন আরো প্রায় ৩০০ নারী শ্রমিক।
কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, পাট, হোগলাপাতা, কচুরিপানা ও খড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ, ম্যাট, পাপোশ, পেট হাউজ ফাইল বক্স, বাস্কেট, ফুলের টব, বাটি, ঝুড়ি, টিফিন বক্স, টিস্যু বক্সসহ অর্ধশতাধিক সামগ্রী। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও শ্রমিক হিসেবে এ কারখানায় কাজ করছেন। কেউ কেউ পণ্য তৈরি করছেন, কেউবা ফিনিশিং, চেকিং ও সুতা ববিনে ভরছেন। আবার কেউ তৈরীকৃত পণ্য প্যাকেজিং ও সাজানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
উদ্যোক্তা সাবেকুন্নাহার মিতু জানান, লাম ক্রিয়েশনের কারখানায় উৎপাদিত হস্তশিল্প সামগ্রী বায়ারদের মাধ্যমে ইউরোপের কয়েকটি দেশে রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৩৫-৪০ লাখ টাকার পণ্য বিদেশে যাচ্ছে। এ হিসেবে প্রতি মাসে সব ব্যয় বাদে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সাবেকুন্নাহার মিতু বলেন, ‘এ কারখানার মাধ্যমে আমি যেমন স্বাবলম্বী হয়েছি, তেমনই এলাকার নারী-পুরুষদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছি।’ স্বল্প সুদে সরকারি সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে লাম ক্রিয়েশনে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশাবাদী তিনি।
কারখানাসংশ্লিষ্টরা জানান, হস্তশিল্প সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের মধ্যে হোগলাপাতা নোয়াখালী ও ভোলা থেকে সংগ্রহ করা হয়। আর ঢাকা থেকে সুতা আনা হয়। এ কারখানায় ৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দামের বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয়।
কারখানার শ্রমিক শাওন মোল্যা (১৯) জানান, গ্রামে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় স্থানীয়রা বাড়িতে থেকেই প্রতি মাসে ভালো টাকা উপার্জন করতে পারছেন। কয়েকজন নারী শ্রমিকের ভাষ্য, এখানে কাজ করে উপার্জিত অর্থে সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে, সন্তানদের লেখাপড়া করানো সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ের প্রমোশন কর্মকর্তা মো. মাইনুল হাসান বলেন, ‘পাট, হোগলাপাতা ও কচুরিপানা দিয়ে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির বিষয়টি আশাব্যঞ্জক।’ তিনি হস্তশিল্প কারখানাটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।